তিন বাহিনীর প্রধানের প্রতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আযমীর চিঠি

Uncategorized

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী সেনা,নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নিজের ভেরিফাই ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট শেয়ার করেন যা হুবহু তুলে ধরা হলো:

সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানদের প্রতি খোলা চিঠি —

প্রিয় জেনারেল ওয়াকার, এডমিরাল নাজমুল ও এয়ার চিফ মার্শাল হাসান,
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। আশা করি তোমরা ভালো আছো এবং যথাযথভাবে পবিত্র রমযান মাসের ইবাদাতসমূহ পালন করে যাচ্ছো।

আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থান পবিত্র কাবায় বসে বাংলাদেশের কদরের রাত, শুক্রবার রাতে তোমাদেরকে এই চিঠি লিখছি।

প্রথমেই তোমাদেরকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাই সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে তোমাদের প্রশংসনীয় ভূমিকার জন্য। তোমাদের প্রতি আমার বিশ্বাস ও আস্থা ছিল যে, তোমরা সশস্ত্র বাহিনীর হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে। জাতির আশা, আকাঙ্ক্ষা ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে নির্বাচনে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে তোমরা তা প্রমাণ করে আমাকে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সকল সদস্যকে গর্বিত করেছো।

সূরা আলে ইমরানের ২৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব/ক্ষমতা দেন … যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন …’ (৩:২৬)। মহান আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমতা ও সন্মান দুটোই দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ। আমি এই পবিত্র দিনে পবিত্র স্থান থেকে তোমাদের জন্য দোয়া করছি তিনি যেন তোমাদের সন্মান আরো বৃদ্ধি করেন।

তোমরা আমার স্নেহের ছোট ভাইয়ের মত। ওয়াকার আমার ছাত্র আর নাজমূল (মিরপুর ষ্টাফ কলেজে) আমার কলিগ ও প্রতিবেশী। হাসানের সাথে ঘনিষ্টতা না থাকলেও পরিচয় আছে। তোমরা নিশ্চয়ই জানো এবং বুঝো যে, আমি তোমাদেরকে স্নেহ করি, ভালোবাসি। আমিও জানি, তোমরা আমাকে অন্তর থেকে ভালোবাসো, শ্রদ্ধা কর। তোমাদের সাথে আমার এই সম্পর্কের দাবীতে আজ একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তোমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

তোমরা জানো, আওয়ামী সরকারের আমলে হাজার হাজার সামরিক ও বেসামরিক অফিসার বঞ্চনার শিকার হয়েছিল, লাঞ্চিত ও নিগৃহীত হয়েছিল। জেল, যুলুম, গুম, খুনের শিকার হয়েছিল অনেকেই।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শত শত বেসামরিক কর্মকর্তা পদ, পদবী, পদন্নোতি (৩/৪ পদ) পেয়ে সকল সুযোগ সুবিধা ফিরে পেয়েছেন। তাদের প্রতি যে যুলুম করা হয়েছিল তার সন্মানজনক প্রতিদান তারা পেয়েছেন।

কিন্তু, দূ:খজনক হলেও সত্য যে, ১৯ মাস পেরিয়ে গেলেও সশস্ত্র বাহিনীর শত শত অফিসার আজও এর কোন প্রতিকার পায়নি। এরা তোমাদেরই কমরেড, ভাই, বন্ধু, সহকর্মী, সহযোদ্ধা। অনেকেই তোমাদের আপন ভাইয়ের মতো। একটু চিন্তা করে দেখ, আজ তোমাদেরও এমন অবস্থা হতে পারতো! এই অফিসারগুলো গত ১৭ বছর থেকে ব্যক্তিগত, পারাবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে কি সীমাহীন যন্ত্রনায় ছটফট করছে, তা একটু অনুধাবন করার চেষ্টা কর। তোমরা তো এদেরই “ব্রাদার অফিসার”। এদের অনেকের পরিবারের সাথেই তোমাদের আত্মিক বন্ধন রয়েছে। তাদের মায়েরা তোমাদের মা এর মত, স্ত্রীরা তোমাদের বোনের মত, সন্তানরা তোমাদের সন্তানের মত। তাদের এই দূ:খ, কষ্ট, ব্যাথা, বেদনা, ভোগান্তি, অন্তরজ্বালা তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারো বলে আমি বিশ্বাস করতে চাই।

আজ পাঁচ সপ্তাহ হলো তিন বাহিনীর ১৪৫ জন অফিসারের পদ, পদবী, পদন্নোতি সংক্রান্ত সরকারি একটি আদেশ (প্রজ্ঞাপন) জারি হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত বাহিনীসমূহের সদর দপ্তরগুলো থেকে এর অবশিষ্ট অনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না হওয়ায় “বঞ্চিত” অফিসারদের ও পরিবারগুলোর ভোগান্তি এখনো চলছেই। অনেকেরই খাবার কেনার টাকা নেই, কারো শিশু সন্তানের দুধ কেনার টাকাও নেই। বিগত ১৭টি বছরের ৩৪/৩৫টি ঈদে এই পরিবারগুলোতে কোন আনন্দ নেই। তাদের কমরেড হিসেবে এই কষ্টের অংশীদার তোমরাও বলে আমি মনে করি।

আল্লাহ আজ তোমাদেরকে ক্ষমতা ও সুযোগ দিয়েছেন তোমাদের এই বঞ্চিত ভাইদের, কমরেডদের পাশে দাড়ানোর। ইতিহাস স্বাক্ষী, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যারা মানুষের উপর যুলুম করেছে (বিগত সরকার) তাদের কি করুণ পরিণতি হয়েছে; এর স্বাক্ষী তোমরা নিজেরাই। আজ, ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ করে তোমরা সেই মজলুমদেরকে তাদের প্রাপ্য পেতে সাহায্য করলে (তোমাদের জন্য) আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্যাদা পাওয়া নিশ্চিত বলে আমি অন্তর থেকে বিশ্বাস করি। আমি আশা করি, এই মহাসুযোগ কাজে লাগিয়ে তোমরা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করা থেকে নিজেদের বঞ্চিত করবেনা।

তোমাদের বড় ভাই হিসেবে আজকে পবিত্র কাবায় বসে তোমাদের কাছে আমি বিশেষভাবে অনুরোধ করছি, ঈদের আগে আর যে ২/৩টা মাত্র কর্মদিবস বাকি আছে, তোমরা দয়া করে এর মধ্যেই (ঈদের আগেই) সরকারি আদেশ (প্রজ্ঞাপন) অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে এই অসহায় অফিসারদের ও পরিবারগুলোর সদস্যদের – যারা তোমাদেরই ভাই, বোন, সন্তানের মত, সেই মানুষগুলোর – মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার ব্যবস্থা কর, তাদের ঈদের আনন্দ ফিরিয়ে দাও। তোমাদের সামান্য সদিচ্ছাই এতগুলো মানুষের কষ্ট দূর করার জন্য যথেষ্ট। আমার আশংকা যে, ক্ষমতা ও সুযোগ কাজে লাগিয়ে এতগুলো অসহায় পরিবারের এই বৈধ অধিকার ফিরিয়ে না দিলে আল্লাহ তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হন কি না! আমি কাবায় বসে অন্তর থেকে দোয়া করছি/ করবো যেন মহান প্রভু তোমাদের সন্মান আরো অনেক বাড়িয়ে দেন।

অনেক আশা নিয়ে, দাবী নিয়ে এই কমরেডদের জন্য, ব্রাদার অফিসারদের জন্য তোমাদের প্রতি আমার এই আবেদন। আমি আশা করি, তোমরা আমাকে নিরাশ করবেনা।

তোমাদেরই,

আযমী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *