ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার চিঠি

জাতীয়

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে (আইসিটি) চিঠি দিয়েছে যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক বিখ্যাত আইনি প্রতিষ্ঠান ‘কিংসলে ন্যাপলি’।

তবে বুধবার (১ এপ্রিল) এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ছাড়াও প্রসিকিউশন অফিস কিংবা ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কেউই চিঠি প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি।

সোমবার (৩০ মার্চ) শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে পাঠানো এ চিঠিতে অবিলম্বে ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাতিল চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইন মেনে, নোটিশ দিয়ে এবং শেখ হাসিনার পছন্দের আইনজীবীর উপস্থিতি নিশ্চিত করে নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠনেরও দাবি জানানো হয়। এসব দাবির বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা আগামী ১৪ দিনের (১৩ এপ্রিল) মধ্যে নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

শেখ হাসিনার পক্ষে ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া ১০ পাতার চিঠিতে শেখ হাসিনার মামলার বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ত্রুটি ও অসঙ্গতি চিহ্নিত করে সে বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই চিঠি পাঠানোর মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ার বৈধতা স্বীকার করা হচ্ছে না উল্লেখ করে কিংসলে ন্যাপলির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ করার অধিকার রাখেন।

কিংসলে ন্যাপলির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শেখ হাসিনার বিচার এমন এক বৈরী পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে আওয়ামী লীগ ও এর সমর্থকদের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিক পদক্ষেপ চলমান ছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতা, অপরাধীদের দায়মুক্তি এবং আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীদের গ্রেপ্তারের মতো ঘটনা ঘটেছে। এমনকি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীদের ওপর শারীরিক হামলা চালানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

বিচার প্রক্রিয়ায় চারটি মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে চিঠিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার মামলার বিচার করার কোনো আইনি এখতিয়ার আইসিটির নেই। ১৯৭৩ সালের আইসিটি আইনটি মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল। এই ট্রাইব্যুনালের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়কালের বাইরে বিচার করার কোনো ম্যান্ডেট ছিল না। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে অন্তর্বর্তী প্রশাসন জুলাই মাসের বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত অপরাধের বিচারের জন্য এই আইন সংশোধন করে; যা ট্রাইব্যুনালের সাংবিধানিক উদ্দেশ্যের বাইরে একটি বেআইনি সম্প্রসারণ। জুলাইয়ের সময়কার ঘটনাবলি বাংলাদেশের সাধারণ ফৌজদারি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়।

র্তমান ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে আইসিসিপিআরের ১৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে দেওয়া চিঠিতে মন্তব্য করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আইসিটির বিচারিক বেঞ্চ এবং প্রসিকিউটর টিম বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকা ব্যক্তিদের দ্বারা পুনর্গঠন করা হয়। আগের বিচারকরা আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর না নেওয়া বা অপসারিত না হওয়া সত্ত্বেও তাদের কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সরিয়ে দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার হাইকোর্টে ২৩ জন অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ দেয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে সেখান থেকে তিনজনকে নিয়ে আইসিটির নতুন বেঞ্চ গঠন করা হয়।

এ ছাড়াও ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার এবং বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অপর বিচারক বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রকাশ্য সম্পর্ক রয়েছে এবং তাকে ট্রাইব্যুনালে নিয়োগের মাত্র ৬ দিন আগে হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া চিঠিতে বর্তমান প্রসিকিউটর টিমেকে পক্ষপাতমূলক বলে দাবি করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আইনজীবী ছিলেন এবং তিনি ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’-এর যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি বিচার চলাকালীন সময়েও দলের সমাবেশে অংশ নিয়েছেন। তাজুল ইসলাম ২০২৫ সালের মার্চ মাসে একটি সমাবেশে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছিলেন। এ ছাড়াও প্রসিকিউশন টিমের সদস্যদের বিরুদ্ধে ঘুস গ্রহণ ও দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উঠেছে, যা ট্রাইব্যুনালের বৈধতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

চিঠিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে দাবি করে বলা হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশনের হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউট জানিয়েছে যে, চার্জ গঠন সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া শেখ হাসিনাকে তার নিজের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রনিযুক্ত যে আইনজীবী দেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে শেখ হাসিনার কোনো যোগাযোগ বা নির্দেশনার সুযোগ ছিল না।

অভিযুক্তদের অনুপস্থিতিতে বিচার কেবল ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রেই হতে পারে উল্লেখ করে শেখ হাসিনার আইনজীবী বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ করেছে, যা প্রমাণ করে যে তার অনুপস্থিতি স্বেচ্ছায় ছিল না এবং অনুপস্থিতিতে বিচার কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং আইসিসিপিআরের ১৪ অনুচ্ছেদের ন্যূনতম গ্যারান্টি ছাড়া এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ড আরোপ করা মূলত ‘সামারি এক্সিকিউশন’ বা সংক্ষিপ্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সামিল।

চিঠির শেষ অংশে শেখ হাসিনার পক্ষে কিংসলে ন্যাপলি ল ফার্ম কয়েকটি দাবি উল্লেখ করেছে। সেগুলো হলো—শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় এবং সাজা আইনিভাবে বাতিল ঘোষণা করতে হবে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। ভবিষ্যতে যে কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে, যথাযথ নোটিশ দিয়ে এবং নিজস্ব পছন্দের আইনজীবীর উপস্থিতিতে স্বাধীন ট্রাইব্যুনালে করতে হবে। আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত আইনজীবী ও অন্যান্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। আইসিটি এবং বাংলাদেশ সরকারকে উপরোক্ত ত্রুটিগুলো স্বীকার করে তা সংশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও ট্রাইব্যুনাল কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, তা ১৪ দিনের মধ্যে নিশ্চিত করার অনুরোধ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *