যাদের হাতে উঠতে যাচ্ছে ছাত্রদলের নেতৃত্ব!

Uncategorized

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে ঘটতে যাচ্ছে বড় ধরনের রদবদল। জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিদায়ের বার্তা দিয়েছেন বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে ছাত্রদল নেতাদের ‘বিদায়ী’ সাক্ষাৎ সম্পন্ন হওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে ঘোষণা হতে পারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কমিটি।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ ‘বিদায়ী’ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বেলা সাড়ে ৩টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারম্যান কিংবা দলের পক্ষ থেকে ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে কোনো নির্দেশনা আছে কিনা জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, আজকে আমার কাছে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা আসেনি। যদি সেরকম (নতুন কমিটি) কোনো সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই আসবে।

‘রাকিব-নাছির’ কমিটির বিদায় প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘এটা নিঃসন্দেহে দলের হাইকমান্ড তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। তাদের সঙ্গে কী কথা হয়েছে, তাতে কী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এটা আমি এই মুহূর্তে বলতে পারব না। আর যদি চূড়ান্ত পর্যায়ের কিছু হয়, নতুন কিছু হয়— তো সেটা তো নিঃসন্দেহে আমরা প্রেস রিলিজ আকারে আপনাদেরকে বলে দেব। এখন পর্যন্ত আমার কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি।’

সহযোগী-অঙ্গসংগঠনের যেকোনো কমিটি প্রকাশ হয়ে থাকে রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে ও দলীয় প্যাডে। সে কারণে ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে তার কাছে জানতে চান সাংবাদিকরা।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও ছাত্রদলের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি আগস্টেই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।

তবে গত ৩ আগস্ট ছাত্রদলের জাতীয় ছাত্র সমাবেশ স্থগিত হওয়ার পর নতুন কমিটি নিয়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, আগস্টের মধ্যেই কমিটি হতে পারে, আবার কেউ মনে করছেন ঘোষণার সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্লিন ইমেজকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এদিকে শীর্ষ পদপ্রত্যাশীরা শেষ মুহূর্তের সাংগঠনিক তৎপরতা, সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদপ্রত্যাশী নেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পদযাত্রা, মিছিলসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।

সভাপতি পদে আলোচনায় যারা

কেন্দ্রীয় সভাপতি পদে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি রিয়াদ রহমান, এইচ এম আবু জাফর, এজাজুল কবির রুয়েল, খোরশেদ আলম সোহেল এবং মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ আলোচনায় রয়েছেন।

২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, মো. হাসানুর রহমান, শরিফ প্রধান শুভ, সাংগঠনিক সম্পাদক আমানুল্লাহ আমান এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেনের নামও আলোচনায় রয়েছে।

সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায়

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম তারিক ও সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকের নাম আলোচনায় রয়েছে।

২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, গাজী সাদ্দাম হোসেন, ইব্রাহিম খলিল, মাসুদুর রহমান মাসুদ, তারেক হাসান মামুন, নাছির উদ্দীন শাওন এবং জাহিদ হাসান শাকিল সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।

পদপ্রত্যাশী ছাত্রদল নেতারা বলছেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাদের দিয়েই নতুন কমিটি গঠন করা হলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে। তাদের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি যাকে যে দায়িত্ব দেবেন, সেটিই সবাই মেনে নেবেন।

যা বলছেন পদপ্রত্যাশীরা

শীর্ষ পদপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক রিয়াদ রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে ছাত্রলীগের দখলদারিত্ব, সিট বাণিজ্য ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের কারণে ছাত্ররাজনীতির মূলধারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তার দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও শোষণই গণঅভ্যুত্থানে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের অন্যতম কারণ ছিল এবং এর ধারাবাহিকতায় ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে।’

তিনি বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধ কোনো সমাধান নয়। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই ছাত্রসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব হতে হবে নৈতিক, শিক্ষার্থীবান্ধব ও গ্রহণযোগ্য। ছাত্রনেতাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, কল্যাণ এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা থাকতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্যান্টিনে পর্দা টাঙানোর মতো প্রতীকী উদ্যোগ নয়, বরং সারা দেশের শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা সমাধানই ছাত্রসংগঠনের প্রধান দায়িত্ব। নেতৃত্ব এমন ব্যক্তির হাতে যেতে হবে, যিনি সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখবেন, নিজের সংগঠনের ভুলের সমালোচনা করার সাহস রাখবেন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিবন্ধকতামুক্ত পরিবেশ তৈরিতে কাজ করবেন।’

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান বলেন, ‘সংগঠনের নেতাকর্মীরা নতুন কমিটির জন্য, নতুন জুলাইয়ে, নতুন সরকারের কাছে মুখিয়ে রয়েছেন। নতুন কমিটির নেতৃত্বে দেশ গড়ায় অংশ নেবে ছাত্রদল।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংগঠনের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত আমার একটি নিবিড় যোগাযোগ ও সম্পর্ক রয়েছে। আমার সেই সহযোদ্ধা-সহকর্মীরা আমাকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চান। আমি সংগঠনের তৃণমূলে যারা রয়েছে এবং দলের সর্বোচ্চ সাংগঠনিক অভিভাবক, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস রাখি। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই আলোকে কাজ করতে আমি সদা প্রস্তুত।’

কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ বলেন, ‘নতুন নেতৃত্ব ও নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সারা দেশের ছাত্রদল অপেক্ষা করছে। তারা আশা করছেন, সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিগগিরই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি উপহার দেবেন।’

ঢাবি ছাত্রদলের নতুন কমিটিও দোরগোড়ায়

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার নতুন কমিটিও যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটি সাধারণত একসঙ্গে বা কাছাকাছি সময়ে ঘোষণা করা হয়। সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে ঢাবি শাখাকেও নতুনভাবে সাজানো হয়।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত হওয়ায় দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হিসেবে বিবেচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নতুন নেতৃত্ব নিয়েও জোর আলোচনা চলছে। দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, চলতি সপ্তাহেই কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে ঢাবি শাখার নতুন কমিটিও ঘোষণা হতে পারে।

বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কমিটি ২০২৪ সালের মার্চে গণেশ চন্দ্র রায় সাহসকে সভাপতি এবং নাহিদুজ্জামান শিপনকে সাধারণ সম্পাদক করে এক বছরের জন্য ঘোষণা করা হয়েছিল। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই নতুন কমিটি গঠনের আলোচনা শুরু হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কারণে তা পিছিয়ে যায়।

ঢাবি ছাত্রদলের শীর্ষ পদে যাদের নাম

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নেতা আলোচনায় রয়েছেন। ২০১৩-১৪ সেশন থেকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জসিম খান ও গাজী মোহাম্মদ আল-আমিন, সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মাহমুদুল হাসানকে সম্ভাব্য শীর্ষ নেতৃত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ ছাড়া ২০১৪-১৫ সেশন থেকে বিজয় একাত্তর হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বি এম কাওসার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফ খান এবং আলমগীর হোসেন আলম আলোচনায় রয়েছেন।

২০১৫-১৬ সেশন থেকে যুগ্ম সম্পাদক বজলুর রহমান বিজয়, আবিদুল ইসলাম খান এবং ২০১৬-১৭ সেশন থেকে সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক আবু হায়াত মো. জুলফিকার জেসান, প্রচার সম্পাদক তানভীর হাসান এবং শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক মাহমুদুল হাসানের নামও সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছে।

২০১৭-১৮ সেশন থেকে আপ্যায়ন সম্পাদক আরিফুল ইসলাম, আন্তর্জাতিক সম্পাদক মেহেদী হাসান, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক সৈয়দ ইমাম হাসান অনিক ও ক্রীড়া সম্পাদক সাইফুল্লাহ সাইফ আলোচনায় রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *