রুমিন ফারহানার কাহিনী কি? যে কথায় কাঁপলো পুরো সংসদ

Uncategorized

সন্তানরা বাবা-মায়ের সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার পর তাদেরকে নিজেদের বাড়ি থেকে বিতাড়িত করে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিচ্ছে, এমন বাস্তবতা তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেছেন, যে বাবা-মা সন্তানকে মানুষ করতে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টুকু পার করে দেন, শেষ বয়সে তাদের যদি নিজের সন্তানের কাছেই জায়গা না হয়, এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে পিতা-মাতার সম্পত্তি ও অধিকার-সংক্রান্ত আইন নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

রুমিন ফারহানা বলেন, “পবিত্র কোরআনে পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের একজন বা উভয়ে বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের সঙ্গে ‘উফ’ শব্দটিও উচ্চারণ না করার নির্দেশ রয়েছে। অথচ, বাস্তব জীবনে আমরা এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখতে পাচ্ছি।”

তিনি বলেন, “আমাদের আত্মা ভেঙে যায়; যখন দেখি, সন্তানরা বড় বড় দালানে গিয়ে বসবাস করছে, অথচ সেই সন্তানই বাবা-মায়ের সম্পত্তি দখল করে নিচ্ছে।”

অনেক সময় চাপ সৃষ্টি করে কিংবা নানা কৌশলে বাবা-মায়ের কাছ থেকে সম্পত্তি লিখে নেওয়া হয়, উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পর সেই বাবা-মায়ের জায়গা হয় ওই বিশাল ভবনের একেবারে কোণার একটি অংশে। অনেক সময় সেই জায়গাটুকুও তাদের জন্য থাকে না। শেষ পর্যন্ত তাঁদের বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।”

দান করা সম্পত্তি বাতিলের সুযোগ চান

পিতা-মাতার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন আনার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান রুমিন ফারহানা। একইসঙ্গে আইনটিকে আরো কার্যকর করতে কয়েকটি প্রস্তাব দেন তিনি।

রুমিন ফারহানা বলেন, সন্তান পিতা-মাতার ভরণপোষণ না করলে কিংবা তাদের অবহেলা ও নির্যাতন করলে দান করা সম্পত্তি বাতিলের সুযোগ আইনে রাখা প্রয়োজন। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, সন্তান যদি পিতা-মাতাকে অবহেলা, নির্যাতন বা ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে দাতা যেন এককভাবে রেজিস্ট্রি করা দানপত্র বাতিলের জন্য পারিবারিক আদালতে আবেদন করতে পারেন, আইনে এমন সুযোগ রাখা দরকার।

বাবা-মায়ের সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া ঠেকানোর প্রস্তাব

পিতা-মাতার দেওয়া সম্পত্তি সন্তান যেন তাদের অজান্তে বা সম্মতি ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে বন্ধক রাখতে না পারে, সে বিষয়েও স্পষ্ট বিধান প্রয়োজন বলে জানান রুমিন ফারহানা।

তিনি বলেন, অনেক সময় সন্তান বাবা-মায়ের সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেয়। পরে সেই ঋণের দায় গিয়ে পড়ে বাবা-মায়ের ওপর। এমনকি তাদের নিজেদের বাড়ি থেকেও বের করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই হতে দেওয়া যায় না।

রুমিন ফারহানার প্রস্তাব, দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় তার লিখিত সম্মতি ছাড়া দান করা সম্পত্তি ব্যাংকে বন্ধক রাখা, ওই সম্পত্তির বিপরীতে ঋণ নেওয়া কিংবা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন।

৬০ থেকে ৯০ কার্যদিবসে মামলা নিষ্পত্তির প্রস্তাব

এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে সংক্ষিপ্ত ও দ্রুত বিচার বা সামারি ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, জেলা জজ আদালতে বছরের পর বছর মামলা চললে অসহায় বাবা-মা শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাওয়ার আগেই হয়তো সবকিছু হারিয়ে ফেলবেন।

পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে ৬০ থেকে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন রুমিন ফারহানা এমপি।

পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা, জীবনযাপন কিংবা আর্থিক প্রয়োজনে দাতা যেন দান করা সম্পত্তি থেকে পাওয়া আয়, ভাড়া, ফসল বা মুনাফা ব্যবহারের অধিকার রাখতে পারেন, সেই সুরক্ষাও আইনে নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন তিনি।

‘বাবা-মাকে সন্তানের দয়া বা করুণার ওপর নির্ভর করতে দেওয়া যাবে না’

সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, বাবা-মা সন্তানকে মানুষ করার জন্য জীবনের সবকিছু উজাড় করে দেন। তাই, জীবনের শেষ সময়ে এসে তাদের যেন সন্তানের দয়া বা করুণার ওপর নির্ভর করতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, আইন এমন হতে হবে, যাতে বাবা-মায়ের সম্পত্তির পাশাপাশি তাদের সম্মান, নিরাপত্তা ও শেষ বয়সের অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।

রুমিন ফারহানা আশা প্রকাশ করেন, তার প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে আইনটি আরো শক্তিশালী ও কার্যকর করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *