বরিশালের গৌরনদীতে নারী থেকে পুরুষ হওয়ার প্রক্রিয়ায় স্তন অস্ত্রোপচারের (ম্যাসেকটমি) কয়েক ঘণ্টা পর রোজি আক্তার লিজা (৩১) নামে এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকার পান্থপথ গ্রীন রোডের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর গত ৬ সেপ্টেম্বর ভোরে তার মৃত্যু হয়। নিহত লিজা গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব হাওলাদারের মেয়ে।
রোববার বিকেলে স্বজনেরা লাশ গ্রামে নিয়ে এলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে তড়িঘড়ি করে সন্ধ্যার মধ্যেই লিজাকে দাফন করা হয়।
এলাকাবাসী ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, লিজা ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের মতো চলাফেরা ও পোশাক পরিধান করতেন। বিগত কয়েক বছর ধরে তার সাথে জেমিনী ওরফে জেনিফা আক্তার নামে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর এক তরুণীর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। জেনিফা প্রায়ই লিজাদের বাড়িতে এসে দীর্ঘদিন অবস্থান করতেন। লিজা পুরুষে রূপান্তরিত হয়ে জেনিফাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ঢাকায় হরমোন চিকিৎসাও নিচ্ছিলেন।
বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে টিকটকার তরুণীর মৃত্যু
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, লিজার বাবা-মা অস্ত্রোপচারের জন্য দেড় লাখ টাকা দেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইউনিহেলথ স্পেশাইলাইজড হাসপাতালে ‘সরফরাজ’ নাম দিয়ে তাকে পুরুষ রোগী হিসেবে ভর্তি করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের সম্মতিপত্রে লিজার ‘স্ত্রী’ পরিচয়ে স্বাক্ষর করেন বান্ধবী জেনিফা। জেনিফার দাবি, লিজার বাবা-মায়ের অনুমতিতেই তিনি ওই সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন।
স্থানীয়রা আরও জানায়, প্রায় তিনবছর আগে লিজা তার আপন ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে অজানা উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিল। পরবর্তীতে তারা পুনরায় বাড়িতে ফিরে আসে।
জেমিনী ওরফে জেনিফা আক্তার জানায়, তারা একে অপরের বাসায় অবস্থান করতেন। একসঙ্গে থাকতেন। লিজা ঢাকায় হরমোনের চিকিৎসা করাতো। লিজার মা, বাবা ও বোন স্তন অপারেশনের জন্য দেড় লাখ টাকা দিয়েছেন। ওই টাকা দিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার পান্থপথের ইউনিহেলথ্ স্পেশাইলজড হাসপাতালে সরফরাজ নাম দিয়ে লিজাকে ভর্তি করা হয়। সেখানে অপারেশনের পূর্বে সম্মতিপত্রে লিজার স্ত্রী হিসেবে তিনি (জেনিফা) স্বাক্ষর করেছেন।
মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের স্ত্রী পরিচয়ে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরের বিষয়ে জেনিফা বলেন, লিজার মা ও বাবার সম্মতি নিয়ে আমি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছি।
এ ব্যাপারে মৃত রোজীর বাবা আব্দুর রব হাওলাদার বলেন, জেনিফার স্বাক্ষরে যে অপারেশন হবে সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এমনকি লিজার নাম যে সরফরাজ রাখা হয়েছে তা আজই কেবল শুনলাম। লিজা অপারেশন করে পুরুষ হয়ে জেনিফাকে বিয়ে করবে এমনটা ওর (লিজা) মায়ের কাছে শুনেছি।
লিজার মা ফজিলা বেগম বলেন, আমার মেয়ে লিজা ছোট বেলা থেকেই কোনো ছেলেকে পছন্দ করতো না। তাকে জোড় করে দুইবার বিয়ে দেয়া হয়েছিল। কোনো স্বামীর ঘরে সে সংসার করেনি। ছেলেদের সঙ্গ দেয়া কিংবা ঘর সংসার করার কোনো মন-মানসিকতাই তার ছিলো না।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন থেকে জেনিফা আমাদের বাড়িতে এসে লিজার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে বেড়াতো। সেই সুবাদে লিজার অপারেশনের দায়িত্ব আমরা জেনিফার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলাম সমর্থন করে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইসলাম সমর্থন করে না জানি। তবে মোবাইলে এসব ঘটনা এখন শত শত দেখা যায়।
অপরদিকে ইউনিহেলথ্ স্পেশাইলজড হাসপাতাল থেকে দেয়া মৃত্যু সনদে দেখা গেছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর তাকে (লিজা) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সনদপত্রে লিজার নাম সরফরাজ এবং পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে মৃত্যু সনদপত্রে দেয়া হাসপাতালের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে লিমন নামে এক ব্যক্তি নিজেকে এডমিন পরিচয় দেন। তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জিএমের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
পরবর্তীতে ইউনিহেলথ্ স্পেশাইলজড হাসপাতালের জিএম বিশ্বজিৎ বৈদ্যের কাছে সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কৌশলে দায় এড়িয়ে যে ডাক্তারের অধীনে রোগী ভর্তি হয়েছে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসানের কাছে সার্বিক বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে পরে ফোন করবেন বলে সংযোগের বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।