যে কৌশলে দেশসেরা নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস

Uncategorized

যে কৌশলে দেশসেরা নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসশুধু পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি নয়, বছরজুড়ে নিয়মিত পড়াশোনা, প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি নিবিড় নজরদারি এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সহায়তা; এই কৌশলেই ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রেখেছে নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেনের দাবি, নিয়ম-শৃঙ্খলা, পরিশ্রম এবং শিক্ষক-অভিভাবকের সমন্বিত প্রচেষ্টাই তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

দেশসেরা ফলাফলের জন্য আলোচিত এ প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় বছরের প্রথম দিন থেকেই। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি প্রতিটি অধ্যায় শেষ হওয়ার পর নেওয়া হয় মডেল টেস্ট। প্রতি শনিবার অনুষ্ঠিত হয় রিকভারি ক্লাস। কোনো শিক্ষার্থী প্রতিদিনের পড়া ঠিকমতো দিতে না পারলে স্কুল পরবর্তী কার্যক্রমের মাধ্যমে তা আদায় করে নেওয়া হয়। পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছুটির সুযোগও থাকে না।

প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হলো- প্রতি ১২ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে নিবেদিত গাইড শিক্ষক নিয়োগ। ওই শিক্ষক নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, উপস্থিতি, ফলাফল ও সার্বিক অগ্রগতির নিয়মিত খোঁজ রাখেন। কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

শুধু বিদ্যালয়ে নয়, শিক্ষার্থীর বাড়িতেও পৌঁছে যান শিক্ষকরা। তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত হোম ভিজিটের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীর সমস্যার পাশাপাশি পরিবারের পরিবেশ ও অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করা হয়।

প্রতি বার্ষিক পরীক্ষার পর আয়োজন করা হয় ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবক সমাবেশ। পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণের পাশাপাশি কোন শিক্ষার্থী কেন পিছিয়ে পড়ছে এবং তার উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন; সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে অতিরিক্ত পড়াশোনার ব্যবস্থা। অভিভাবকদের পরামর্শ অনুযায়ী সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অভিজ্ঞ শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে বিদ্যালয়ে বসিয়ে পড়ানো হয়। এ ছাড়া পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল সুবিধাও দেওয়া হয়।

প্রধান শিক্ষক জানান, বিদ্যালয়ের বাৎসরিক ছুটি মাত্র ৩০ দিন। পাশাপাশি প্রতি মাসে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির ফলোআপ করা হয়।

তবে প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের পাশাপাশি টেস্ট পরীক্ষার ফল নিয়ে একটি ভিন্ন চিত্রও রয়েছে। প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন জানান, ২০২৬ সালে বিদ্যালয় থেকে ৪৮৩ জন শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ৩৮২ জন কৃতকার্য হয় এবং তারা সবাই জিপিএ-৫ অর্জন করে। বাকি ১০১ জন টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়।

টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের একটি অংশ পরে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) নিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী টেস্ট পরীক্ষায় ৩৩ শতাংশের কম নম্বর পেলে ফরম পূরণের সুযোগ থাকে না। ফলে কোনো শিক্ষার্থী টিসির জন্য আবেদন করলে নিয়ম অনুযায়ী তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই মাস পর অনুষ্ঠিত হয়। ফলে টেস্ট পরীক্ষার পর শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত সময় পেয়েছিল। ওই সময় ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে কিছু শিক্ষার্থী অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে ভালো ফল করেছে। তাদের প্রতি আমাদের শুভকামনা রয়েছে।

প্রধান শিক্ষকের মতে, টেস্ট পরীক্ষায় ১০১ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে তাদের নিয়মিত পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতিও একটি কারণ। কোভিড-পরবর্তী সময়ে মোবাইল ফোনে আসক্তি, কারিকুলাম পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

মো. ইমন হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ফেরাতে শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীকেও নিজের দায়িত্ব বুঝে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে হবে।

তার ভাষায়, একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কোনো ব্যক্তি বিশেষের দাবি নয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত পরিশ্রমের ফলই ধারাবাহিক সাফল্য এনে দেয়।

নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে তাই একটি বিষয় স্পষ্ট; এখানে ভালো ফলাফলের জন্য শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করা হয় না। বরং প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন আদায়, ছোট ছোট দলে শিক্ষার্থীদের নিবিড় তদারকি এবং দুর্বলদের জন্য বাড়তি সহায়তার মধ্য দিয়েই তৈরি করা হয় সাফল্যের ভিত্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *