শর্তযুক্ত হেবা নিয়ে যে ফতোয়া দিলেন মুফতি আব্দুল মালেক

Uncategorized

পুত্রসন্তানহীন পরিবারে কন্যাসন্তানদের উত্তরাধিকার সুরক্ষা ও জীবনস্বত্ব সংরক্ষণের নামে প্রস্তাবিত ‘হেবা’ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ শরিয়তবিরোধী, বাতিল এবং অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ও মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়ার আমীনুত তালীম মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সহকারী একান্ত সচিব মো. আশিকুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া থেকে শরিয়তের দলিল ও ফিকহের আলোকে এই সুনির্দিষ্ট ফতোয়া প্রদান করা হয়।

শর্তযুক্ত হেবা ও জীবনস্বত্বের বিধান

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পত্তি কন্যাকে হেবা করলেও যদি সম্পত্তিটির ব্যবস্থাপনা, ভোগদখল ও আয় নিজের জন্য সংরক্ষণ করেন এবং মৃত্যুর পর তা কন্যার কাছে হস্তান্তর করার শর্ত জুড়ে দেন, তবে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত হেবা সম্পন্ন হওয়ার অর্থ হলো সম্পত্তি দাতার মালিকানা থেকে সম্পূর্ণ বের হয়ে গ্রহীতার মালিকানায় চলে যাওয়া। দাতা যদি নিজের জন্য আজীবন ভোগদখল বা জীবনস্বত্ব সংরক্ষণ করেন, তবে তা হেবার মূলনীতির সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।

উত্তরাধিকার আইন ও শরিয়তের অপরিবর্তনীয়তা

ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে কার কতটুকু সম্পত্তি প্রাপ্য, তা কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত। সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক প্রয়োজন বা অন্য কোনো যুক্তির দোহাই দিয়ে আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত মিরাসের বিধানে পরিবর্তন বা সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। ইসলামি উত্তরাধিকারের নির্ধারিত অংশ পাশ কাটানো কিংবা মৃত্যুর পর সম্পত্তির বণ্টন নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এ প্রসঙ্গে জামে তিরমিজির (২১১৭ নম্বর) হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করেছেন। অতএব কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই।’ তবে দাতার মৃত্যুর পর সব প্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশ যদি স্বেচ্ছায় ও সম্মতির ভিত্তিতে কোনো বিষয়ে রাজি হন, তবে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কারণ তখন তা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তনের বিষয় থাকে না, বরং ওয়ারিশদের নিজস্ব সম্মতির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

কন্যাকে সম্পত্তি দেওয়ার বৈধ উপায়

কন্যাসন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শরিয়তসম্মত ও বৈধ পথ খোলা রয়েছে। একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি থেকে কন্যাকে হেবা বা দান করতে পারেন। তবে তা অবশ্যই শর্তহীন হতে হবে এবং হেবা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তির মালিকানা ও প্রকৃত দখল গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। হেবা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার আগেই যদি দাতা মারা যান, তবে ওই হেবা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এবং সম্পত্তিটি দাতার সাধারণ উত্তরাধিকার সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ জীবদ্দশায় পূর্ণ মালিকানা হস্তান্তর করে সম্পত্তি দেওয়া বৈধ হলেও, মৃত্যুর পরের উত্তরাধিকার নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে হেবাকে মাধ্যম বানানো শরিয়তসম্মত নয়।

সামাজিক বাস্তবতা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যাসন্তান ও স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং দূরবর্তী আত্মীয়দের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে সমাজে নানা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে এসব সামাজিক বাস্তবতা বা মানুষের পছন্দ-অপছন্দ ইসলামি উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জীবদ্দশায় শর্তহীন ও শরিয়তসম্মত পন্থায় সম্পত্তি হস্তান্তর এবং অন্যান্য অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমেই কেবল উদ্ভূত সমস্যার সমাধান খোঁজা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *