মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি, মৃত্যুর আগে মুক্তা

Uncategorized

পঁচিশ বছর বয়সী মুক্তা ইসলাম মাওয়ার পায়ে শিকল। বাসার খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে তাঁকে। ওই তরুণীকে সহিংস শাস্তি দিতে এমন অমানবিক আয়োজন তাঁর স্বামী সোহেল শিকদারের (৩১)। কয়েক সেকেন্ড পরপর তাঁকে চামড়ার বেল্ট দিয়ে সজোরে পেটানো হচ্ছিল। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল মুক্তার চোখ-মুখ। শরীরজুড়ে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। মায়ের ওপর এমন বর্বর নির্যাতনের সময় পাশের রুমে কাঁদছিল তাঁর দুই সন্তান সাফওয়ান (৫) ও তাসফিয়া (৪)। দুই শিশুর কান্না কী করে সহ্য করবেন মা! তখন মুক্তা তাঁর স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’ সন্তানের কান্না ও স্ত্রীর অশ্রুসজলেও মন গলেনি সোহেলের।

রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে স্ত্রীকে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে এর ভিডিও করেন সোহেল শিকদার। সেই ভিডিও মুক্তার ভাইয়ের মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে সোহেল লেখেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’

এরপর খিলক্ষেতের বাসা থেকে গত বৃহস্পতিবার মুক্তাকে নিয়ে যান স্বজনরা। তবে সেটি তাঁর নিথর দেহ! সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিলেন মুক্তা। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, সোহেল নির্যাতনের পর হত্যা করে স্ত্রীকে ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করছেন। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ ও যৌতুকের জন্য কয়েক মাস ধরে মুক্তাকে নির্যাতন করে আসছিলেন সোহেল।

৩ মিনিটের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তাকে পেটানোর সময় সোহেল বলছিলেন, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু। তোকে আমি ছাড়ব না। তোকে আজ ছাড়ব কি ছাড়ব না, এটা আমার বিবেচনা। একবার শুধু কথা ক।’ বেল্ট দিয়ে নির্দয়ভাবে পেটানোর পর তাঁর শরীরে রক্তাক্ত কালচে জখম হয়ে যায়। এক পর্যায়ে মুক্তা বলছিলেন, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ এ কথা বলার পর তাঁকে আরও পেটানো হয়। তখন মুক্তা বলছিলেন, ‘আমাকে আর মাইরো না, ও আল্লাগো।’ নির্যাতনের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে চোখ বন্ধ করে অনুচ্চ স্বরে কিছু একটা বলছিলেন তিনি। তখনও তাঁর শরীরে বেল্ট দিয়ে আঘাত চলছিল।

মুক্তার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গত শুক্রবার খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন তাঁর ছোট ভাই তানভীর রহমান। এজাহারে বলা হয়, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে এমন সন্দেহে মুক্তার ওপর নির্যাতন করে আসছিলেন সোহেল শিকদার। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট মুক্তাকে বেল্ট দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জখম করা হয়। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই দিন মুক্তার ওপর নির্যাতনের ভিডিও তার এক স্বজনকে পাঠান সোহেল। তখন হুমকি দেন, মুক্তাকে মেরে ফেলা হবে। পরে গত বৃহস্পতিবার মুক্তার লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়ার খবর পান স্বজনরা।

তানভীর রহমান সমকালকে জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই তাঁর বোনের লাশ সিলিং ফ্যান থেকে নামানো হয়েছে। কয়েক মাস আগে আমার কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন সোহেল। সেই টাকা দিতে দেরি হওয়ায় বোনকে মারধর করা হতো।

তিনি আরও বলেন, মাকে হারিয়ে তাঁর দুই বাচ্চা সারা দিন কান্নাকাটি করছে। বারবার বলছে, বাবা মাকে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে। এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

তানভীর বলেন, আমরা চার ভাই-বোন। বাবা ছোটবেলায় মারা যান। মা আমাদের বড় করেছেন। অনেক নির্যাতনের পর মায়ের কষ্টের কথা চিন্তা করে আমার বোন অনেক কিছু গোপন করতেন। নির্যাতন সহ্য করার পরও মারা যাওয়ার আগে পুলিশের কাছে যায়নি।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ের পর থেকে মুক্তা খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে থাকেন। সোহেল প্রথমে খিলক্ষেত এলাকার মুদি দোকানি ছিলেন। পরে তিনি এম্ব্রয়ডারি ব্যবসায় জড়ান। সেখানেও ভালো করতে পারেননি। এরপর স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তি শুরু করেন। শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক চাওয়া শুরু করেন।

খিলক্ষেত থানার ওসি মুহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন সমকালকে বলেন, মুক্তাকে পেটানোর যে ভিডিওটি পাওয়া গেছে, সেটি তাঁর মৃত্যুর তিন দিন আগের। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে এটি হত্যা, না আত্মহত্যা। প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর কল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে কল এসেছিল ১৮ হাজার ৬২৬টি। ২০২৪ সালে অভিযোগ আসে ২৩ হাজার ৩৩টি। এর মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল ১১ হাজার ৪১৮টি। ২০২৩ সালে ২৬ হাজার ৭৯৮টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৯ হাজার ৯১৩টি। ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭১২টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৬ হাজার ৫৬০টি। ২০২১ সালে ১২ হাজার ১৬৯টি অভিযোগের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে ছিল ৩ হাজার ৩৪৮টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *